বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ রচনা ২০ / ২৪ পয়েন্ট (৩য়, ৫ম, ৯ম শ্রেণি)

প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, আজকের ব্লগে আমরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ রচনাটি আপনাদের জন্য শেয়ার করবো। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।  এটি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় রচনা, যা প্রায়শই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষায় এসে থাকে।

এই রচনাটি ১০০০+ শব্দ এবং সুনির্দিষ্ট ২০টি পয়েন্টের ভিত্তিতে লেখা হয়েছে। এতে কোনো অযথা তথ্য বা অপ্রাসঙ্গিক লাইন যুক্ত করা হয়নি। প্রতিটি পয়েন্ট এবং বাক্য সহজ ও সাবলীল ভাষায় সাজানো হয়েছে, যা পরীক্ষায় পূর্ণ নম্বর পেতে নিশ্চিতভাবে সহায়তা করবে।

রচনাঃ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ

আরো দেখুনঃ বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প রচনা

ভূমিকা 

স্বাধীনতা হলো একটি রাষ্ট্রের আজন্ম লালিত স্বপ্ন, যা প্রতিটি নাগরিকের আত্মমর্যাদার ভিত্তি। স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হওয়ার মধ্যে যে অসীম গৌরব নিহিত, পরাধীনতায় ঠিক ততটাই থাকে গ্লানি। তাই, কোনো জাতিই দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়তে চায় না। বছরের পর বছর ধরে শাসনে-শোষণে নিষ্পেষিত বাঙালি জাতিও তাই পাকিস্তানি শাসকদের দাস হয়ে থাকতে চায়নি।

ফলস্বরূপ, তারা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে আন্দোলন-সংগ্রামে সোচ্চার হয়েছিল। ১৯৭১ সালে বীর বাঙালি জাতি রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে ছিনিয়ে আনে তাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। ৩০ লক্ষ প্রাণের আত্মাহুতি এবং লাখো বীরাঙ্গনার সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয় এ দেশের স্বাধীনতা।

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি

১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে ভারতীয় উপমহাদেশে। এই অঞ্চলে মূলত হিন্দু ও মুসলমান এই দুই প্রধান ধর্মাবলম্বীর বাস ছিল। ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেই সৃষ্টি হয় দুটি নতুন রাষ্ট্র মুসলমান-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো নিয়ে পাকিস্তান এবং হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকা নিয়ে ভারত।

বাংলাদেশ, যা তখন পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল, তা ছিল পাকিস্তানের একটি প্রদেশ। অপর প্রদেশটির নাম হয় পশ্চিম পাকিস্তান। তবে শুরু থেকেই পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানের ধনিক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল।

এর ফলস্বরূপ, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থা সবকিছুকেই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে থাকে এবং ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি করে। এই বৈষম্য ও শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার জনগণ বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন, সংগ্রাম ও প্রতিবাদ গড়ে তোলে।

সেই প্রতিবাদের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, যেখানে মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষা করার জন্য লড়াই হয়। এই আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালি জাতি প্রথমবারের মতো একটি অভিন্ন চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়। এরপর, বাঙালি জাতি ধাপে ধাপে এগিয়ে যায় স্বাধীনতার পথে।

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে (যা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এই যুগান্তকারী ভাষণে তিনি মূলত পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ, শাসন ও বঞ্চনার ইতিহাস তুলে ধরেন।

পাশাপাশি, নির্বাচনে বিপুল জয় লাভের পরও কীভাবে বাঙালির সাথে প্রতারণা করা হয়েছে এবং বাঙালির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পটভূমি কী ছিল, সে বিষয়েও আলোকপাত করেন। বিশ্ব ইতিহাসে তো বটেই, বিশেষ করে বাঙালি জাতির ইতিহাসে এই ভাষণটি একটি স্মরণীয় দলিল হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে আছে।

স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক যাত্রা

৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষিত কর্মসূচি এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের আহ্বানের প্রতি সাড়া দিয়ে সকল স্তরের জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়। এর ফলস্বরূপ, পূর্ব বাংলার সকল অফিস, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়।

পূর্ব পাকিস্তানের এই বেগতিক অবস্থা দেখে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য। এ সময় জুলফিকার আলি ভুট্টোও ঢাকায় আসেন। তবে আলোচনার নামে তারা গোপনে কালক্ষেপণ করতে থাকে। এই সময়ের সুযোগ নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য ও গোলাবারুদ এনে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়।

অপারেশন সার্চলাইটের সূচনা

অবশেষে, আলোচনার নামে কালক্ষেপণের পর ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী শুরু করে ‘অপারেশন সার্চলাইট’, যা পৃথিবীর ইতিহাসে এক বর্বরতম গণহত্যা।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সরাসরি নির্দেশে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী রাতের অন্ধকারে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অতর্কিতভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং বহু মানুষকে হত্যা করে। এই বর্বরোচিত ‘অপারেশন সার্চলাইটের’ নীল-নকশা তৈরি করেছিলেন সামরিক কর্মকর্তা রাও ফরমান আলী ও টিক্কা খান।

স্বাধীনতার ঘোষণা

২৫শে মার্চের কালরাত্রিতেই, অর্থাৎ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরেই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। তিনি ওয়্যারলেসযোগে এই ঘোষণাটি চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠিয়ে দেন। ঘোষণাটি ইংরেজিতে দেওয়া হয়েছিল, যাতে বিশ্ববাসী এর বিষয়বস্তু সহজেই বুঝতে পারে।

বঙ্গবন্ধুর এই স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। শুরু হয় পাকিস্তানি সশস্ত্র সেনাদের সঙ্গে বাঙালি, আনসার ও নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের এক অসম ও মরণপণ লড়াই। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই যুদ্ধই মহান মুক্তিযুদ্ধ নামে পরিচিত।

মুক্তিযুদ্ধের সূচনা এবং মুজিবনগর সরকারের কার্যক্রম

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের সাথে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন। তিনি তাদের নির্দেশ দেন যে, পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করলে যেন তা প্রতিহত করা হয়। এছাড়া, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সরকার গঠন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ে করণীয় বিষয়গুলো নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামানুসারে মেহেরপুর জেলার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননকে মুজিবনগর নামকরণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা, এটিকে সুসংহত করা এবং বিশ্বজনমত গঠনের লক্ষ্যে ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল এই ‘মুজিবনগর সরকার’ গঠিত হয়েছিল।

এই সরকার মূলত বাঙালি কর্মকর্তাদের নিয়েই প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করেছিল। সুসংগঠিতভাবে কাজ পরিচালনার জন্য এতে মোট ১২টি মন্ত্রণালয় বা বিভাগ অন্তর্ভুক্ত ছিল। অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি, বিশ্বজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সমর্থন আদায়ের জন্য মুজিবনগর সরকার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়।

মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের অংশগ্রহণ

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বস্তরের বাঙালি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। দেশের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর মানুষও এই মহান সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়, যার ফলে এই যুদ্ধকে গণযুদ্ধ বা জনযুদ্ধ বলা হয়। বস্তুত, জনগণই ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, ছাত্র, পেশাজীবী, নারী এবং সাংস্কৃতিক কর্মীসহ আপামর জনসাধারণ নিজ নিজ অবস্থান থেকে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। জীবনের মায়া তুচ্ছ করে তারা দেশকে শত্রুমুক্ত করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।

মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য কর্নেল আতাউল গনি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি করে মুক্তিবাহিনী গঠিত হয়েছিল। এর সর্বাধিনায়ক ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সুষ্ঠুভাবে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য পুরো দেশকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়। অবশেষে, ৩রা ডিসেম্বর থেকে মুক্তিবাহিনীর সাথে ভারতীয় মিত্রবাহিনী যুক্ত হয়ে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ পরিচালনা শুরু করে।

মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা কখনো সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে সক্রিয় ছিলেন, আবার কখনো যুদ্ধক্ষেত্রের আড়ালে থেকে অবদান রেখেছেন। অসংখ্য নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছেন। বহু নারী অজানা-অচেনা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রূষা করেছেন।

চরম দুঃসময়ে পাকিস্তানি হানাদারদের হাত থেকে রক্ষা করতে নিজেদের বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছেন। এই সংগ্রামে অনেক নারীকে শত্রুর কাছে নিজেদের সম্ভ্রম ও প্রাণও দিতে হয়েছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী বাঙালিরাও বহুমুখী সহযোগিতা করেছেন।

তারা বিভিন্ন দেশে মুক্তিযুদ্ধের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন। বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে তারা বিভিন্ন দেশের নেতৃবৃন্দের কাছে ছুটে গিয়েছেন। এছাড়া, তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছেন। প্রবাসীরা বিশ্বের বিভিন্ন সরকারের নিকট আবেদন জানিয়েছেন যেন পাকিস্তানকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ না করা হয়। এক্ষেত্রে ব্রিটেনের প্রবাসী বাঙালিদের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

মুক্তিযুদ্ধে শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা

যুদ্ধের সময়ে দেশপ্রেম জাগ্রতকরণ, মনোবল বৃদ্ধি এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে শিল্পী, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ও অবদান ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তাদের প্রচেষ্টাগুলোর মধ্যে ছিল: পত্রপত্রিকায় লেখালেখি, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে খবর পাঠ,  দেশাত্মবোধক ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গান, আবৃত্তি, নাটক ও কথিকা প্রচার এবং জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘চরমপত্র’ পরিচালনা।

এসব উদ্যোগ মুক্তিযুদ্ধকে দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা করেছিল। অন্যদিকে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অবদান ছিল অপরিসীম। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন।

তারা নানা অত্যাচার-নিপীড়ন সহ্য করেছেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জীবন বাজি রেখে রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে গেছেন। এই ব্যক্তিত্বদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জাতীয় চার নেতা ছিলেন অন্যতম।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। এক্ষেত্রে সংবাদপত্র এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ২৬শে মার্চ চট্টগ্রামের শিল্পী ও সংস্কৃতি কর্মীরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু করেন। পরে এটি মুজিবনগর সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।

এই বেতার কেন্দ্র: সংবাদ পরিবেশন করত,  দেশাত্মবোধক গান প্রচার করত এবং মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা এবং রণাঙ্গনের নানা ঘটনা দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরত।

এভাবে এটি সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের প্রতি অনুপ্রাণিত করে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়ে বিজয়ের পথ সুগম করতে সাহায্য করে। এছাড়া, মুজিবনগর সরকারের প্রচার সেলের তত্ত্বাবধানে প্রকাশিত ‘জয়বাংলা’ পত্রিকাটিও মুক্তিযুদ্ধে এক বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করেছিল।

পেশাজীবীদের ভূমিকা

সাধারণ অর্থে, যারা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত, তারাই হলেন পেশাজীবী। পেশাজীবীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন: শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিল্পী, সাহিত্যিক, প্রযুক্তিবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক, বিজ্ঞানী এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দ।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই পেশাজীবীদের ভূমিকা ছিল অনন্য ও গৌরবদীপ্ত। পেশাজীবীদের একটি বিশাল অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

তাঁরা মুজিবনগর সরকারের অধীনে পরিকল্পনা সেল গঠন করে নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাগুলো পালন করেন বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তথ্য সরবরাহ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে সাহায্যের আবেদন ও বক্তব্য প্রদান, শরণার্থীদের উৎসাহ প্রদান এবং  এই মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের অনেক পেশাজীবী শহিদ হন।

জাতিসংঘের ভূমিকা

জাতিসংঘের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা। তবে, ১৯৭১ সালে যখন সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান বাংলাদেশের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে বাঙালি নিধনে তৎপর হন, তখন জাতিসংঘ কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।

জাতিসংঘ এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ এবং মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। এর কারণ হলো, ‘ভেটো’ ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্রের বাইরে জাতিসংঘের নিজস্ব উদ্যোগে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা নেই।

মুক্তিযুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বিশ্ব

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের বর্বরোচিত গণহত্যার খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়, যা বিশ্বজুড়ে জনমতকে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের পক্ষে নিয়ে আসে। ভারত সে সময়ে প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়।

সোভিয়েত ইউনিয়নও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানায়। তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশের বিরোধিতা করলেও, সে দেশের জনগণ, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদরা কিন্তু বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের দুর্গত মানুষকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিটলস ব্যান্ডের জর্জ হ্যারিসন এবং ভারতীয় সঙ্গীতজ্ঞ পণ্ডিত রবিশঙ্কর যৌথভাবে বিখ্যাত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এর আয়োজন করেন। এছাড়াও, ফরাসি সাহিত্যিক আন্দ্রে মালরো এবং জাঁ পল সার্ত্রে-সহ বিশ্বের বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি তখন বাংলাদেশকে সমর্থন জানিয়েছিলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান ছিল অপরিমেয় ও অনস্বীকার্য। ভারতের সাহায্য ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন প্রায় অসম্ভব ছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভারত সরকার বাংলাদেশের জনগণের পাশে এসে দাঁড়ায়। তারা প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান করেছিল।

একই সাথে, ভারত সরকার মুক্তিবাহিনীকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দিয়ে সর্বাত্মক সাহায্য করে। এই সহায়তার ফলে মুক্তিবাহিনী একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীতে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী সরাসরি যুদ্ধে যোগদান করে এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে বাংলাদেশের মুক্তি নিশ্চিত করে।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণ

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন, মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী কোণঠাসা হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে, মিত্র বাহিনীর প্রধান শ্যাম মানেকশ পাকিস্তানি জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজীকে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব দেন।

অবশেষে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জেনারেল নিয়াজী বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে ৯৩ হাজার সৈন্যসহ যৌথ বাহিনীর প্রধান জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। এই ঐতিহাসিক আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ. কে. খন্দকার।

মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক তাৎপর্য

বিশ্ব ইতিহাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই দেশ তৃতীয় বিশ্বের প্রথম রাষ্ট্র, যারা সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে। ১৯৪৭ সাল থেকেই তদানীন্তন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ক্রমাগত অত্যাচার, শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছিল। কিন্তু এই ভূখণ্ডের সংগ্রামী মানুষ এসব অন্যায় আর বৈষম্যের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে রুখে দাঁড়ায়।

দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে সেই বঞ্চনার পরিসমাপ্তি ঘটে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ স্বাধীনতার যে ডাক দেন এবং ২৬শে মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে যে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন, ১৬ই ডিসেম্বর তা বাস্তবে পূর্ণতা পায়।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সর্বান্তকরণে মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বপ্রকার সহযোগিতা করে। ফলস্বরূপ, এই মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী চেতনার এক প্রোজ্জ্বল বহিঃপ্রকাশ। মুক্তিযুদ্ধ এ অঞ্চলের বাঙালি এবং অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর জনগণের মধ্যে নতুন যে দেশপ্রেমের জন্ম দেয়, তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে যুদ্ধ শেষে জনগণ বিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন ও একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করে।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন কেবল একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই ছিল না। তাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত একটি অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়ে তোলা যার নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দিয়েছিলেন ‘সোনার বাংলা’।

আসলে, এই ‘সোনার বাংলা’ গঠনের আকাঙ্ক্ষাই হলো মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা। একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হলে এই চেতনার কোনো বিকল্প নেই। তাই, এই মূল্যবান চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

মুক্তিযুদ্ধের খেতাব

ত্রিশ লাখ মানুষের জীবনদান, আড়াই লাখ নারীর সম্ভ্রমহানি, এবং কোটি কোটি টাকার সম্পদের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ।

যারা নিজেদের জীবনকে তুচ্ছ করে, অকুতোভয় সাহসিকতার সাথে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে করতে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের এই অবদানের প্রতি সম্মান জানাতেই দেওয়া হয়েছে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’, ‘বীরউত্তম’, ‘বীরবিক্রম’ ও ‘বীরপ্রতীক’ এই চারটি রাষ্ট্রীয় খেতাব।

এই বীর শহীদদের মধ্যে সাতজন লাভ করেছেন ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাব। তাঁরা হলেন—

  1. সিপাহি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল
  2. ন্যান্স নায়েক মুন্সী আবদুল রউফ
  3. ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান
  4. ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ
  5. সিপাহি হামিদুর রহমান
  6. স্কোয়াড্রন ইঞ্জিনিয়ার রুহুল আমিন
  7. ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর

তাঁদের এই মৃত্যুঞ্জয়ী স্মৃতি চিরকাল আমাদের সামনে এগিয়ে চলার অনুপম অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

উপসংহার

স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা বরাবরই অনেক কঠিন কাজ। লক্ষ প্রাণের আহুতি আর রক্তগঙ্গার বিনিময়ে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জন করেছি। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ২৪ বছরের শোষণ ও নিপীড়নের অবসান ঘটেছিল। তবে স্বাধীনতার এতটা বছর পার হয়ে গেলেও, আজও আমরা আমাদের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলাদেশ’ সম্পূর্ণভাবে গড়ে তুলতে পারিনি।

স্বাধীন হয়েও, অনেক ক্ষেত্রে আমরা এখনো স্বাধীনতার পূর্ণ স্বাদ উপভোগ করতে পারিনা। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমাদের যেমন কিছু সংকট আছে, তেমনি রয়েছে অফুরন্ত সম্ভাবনাও। সব প্রতিকূলতা ও সংকটকে দূরে সরিয়ে আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত এই রচনাটি যদি আপনার ভালো লেগে থাকে এবং উপকারে আসে, তবে আপনি কমেন্টে ধন্যবাদ লিখতে পারেন এবং রচনাটি অন্যদের সাথে শেয়ার করতে পারেন।