বক্সারের যুদ্ধ কত সালে হয়? কবে ও কাঁদের মধ্যে এই যুদ্ধ হয়েছিলো?

১৭৬৪ সালের ২২ অক্টোবর বিহারের বক্সার নামক স্থানে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, ইতিহাসে তা ‘বক্সারের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। একদিকে ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং অন্যদিকে ছিল বাংলার নবাব মীর কাসিম, অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা এবং মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের সম্মিলিত বাহিনী। পলাশীর যুদ্ধে যে পরাধীনতার বীজ বপন করা হয়েছিল, বক্সারের যুদ্ধের মাধ্যমে তা এক বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়। এই যুদ্ধই মূলত ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি শক্ত করে দেয়।

আরও পড়ুনঃ ইসলামের প্রথম যুদ্ধের নাম কি?

বক্সারের যুদ্ধ সম্পর্কে

পলাশীর যুদ্ধের পর ১৭৫৭ সালে বাংলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর। তবে তার ভোগবিলাসপূর্ণ ও দায়িত্বহীন শাসনব্যবস্থা ইংরেজদের সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ফলে তারা নানা ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়ে মীর জাফরের পুত্র মিরনকে হত্যার ব্যবস্থা করে এবং শেষ পর্যন্ত ১৭৬০ সালে মীর জাফরকে বাংলার মসনদ থেকে সরিয়ে দেয়। এর পর মীর জাফরের জামাতা মীর কাসিম বাংলার নবাব হিসেবে অভিষিক্ত হন। অভিজাত বংশে জন্ম নেওয়া মীর কাসিম ছিলেন তুলনামূলকভাবে দৃঢ়চেতা ও স্বাধীনমনস্ক শাসক। বংশপরিচয়ের দিক থেকে তিনি গুজরাটের সুবেদার সৈয়দ ইমতিয়াজের নাতি ছিলেন।

মীর কাসিম ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা ও দক্ষ প্রশাসক। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে ব্রিটিশদের প্রভাবমুক্ত না হলে বাংলার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব নয়। তিনি তার রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে স্থানান্তরিত করেন এবং নিজের সেনাবাহিনীকে ইউরোপীয় পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন।

যুদ্ধের মূল কারণ

পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা মীর জাফরকে নবাব বানালেও তিনি তাদের অঢেল অর্থের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হন। ফলে ব্রিটিশরা মীর কাসিমকে ক্ষমতায় বসায়। কিন্তু মীর কাসিম ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ এবং স্বাধীনচেতা। তিনি ব্রিটিশদের হাতের পুতুল হয়ে থাকতে চাননি, যা কোম্পানি ও নবাবের মধ্যে দূরত্বের সৃষ্টি করে।

ব্রিটিশদের প্রভাব ও ষড়যন্ত্র থেকে দূরে থাকার জন্য মীর কাসিম রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে বিহারের মুঙ্গেরে স্থানান্তরিত করেন। সেখানে তিনি দুর্গ নির্মাণ করেন এবং নিজের সেনাবাহিনীকে ইউরোপীয় পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ব্রিটিশরা নবাবের এই সামরিক প্রস্তুতিকে তাদের নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে মনে করতে থাকে।

মুঘল সম্রাট ব্রিটিশদের বিনাশুল্কে বাণিজ্যের যে অধিকার দিয়েছিলেন, কোম্পানির কর্মচারীরা সেটির অপব্যবহার করে নিজেদের ব্যক্তিগত বাণিজ্যে ব্যবহার শুরু করে। এতে নবাব বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছিলেন এবং দেশীয় বণিকরা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছিল। এর প্রতিকারে মীর কাসিম সমস্ত দেশীয় বণিকদের ওপর থেকেও শুল্ক তুলে দিলে ব্রিটিশরা ক্ষিপ্ত হয়, কারণ তারা চেয়েছিল বাণিজ্যে একচেটিয়া আধিপত্য।

বক্সারের যুদ্ধ কাদের মধ্যে হয়েছিল? 

ব্রিটিশদের বাংলা থেকে বিতাড়িত করার উদ্দেশ্যে তৎকালীন সময়ের তিনটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি একত্রিত হয়ে একটি শক্তিশালী জোট গঠন করে। এই জোটের অন্যতম নেতা ছিলেন বাংলার প্রাক্তন নবাব মীর কাসিম, যিনি ব্রিটিশ হস্তক্ষেপ থেকে বাংলাকে মুক্ত করে স্বাধীন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন অযোধ্যার নবাব সুজা-উদ-দৌলা, যিনি মীর কাসিমকে আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সামরিক সহায়তাও প্রদান করেন। এ জোটে আরও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন তৎকালীন মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলম, যিনি নামমাত্র সম্রাট হলেও ব্রিটিশদের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং তাদের প্রভাব রোধ করতে আগ্রহী ছিলেন।

পলাশীর যুদ্ধ ছিল মূলত একটি ষড়যন্ত্রের জয়, কিন্তু বক্সারের যুদ্ধ ছিল একটি সত্যিকারের সামরিক বিজয়। এই যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে ব্রিটিশরা প্রমাণ করে যে তারা তৎকালীন ভারতের যেকোনো বড় শক্তিকে হারানোর সক্ষমতা রাখে। এই যুদ্ধের ফলেই ব্রিটিশরা বাংলা, বিহার ও ওড়িশার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের বৈধ অধিকার লাভ করে।

যুদ্ধের ফলাফল 

Buxar battle result

বক্সারের যুদ্ধের ফলাফল ছিল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী এবং ভারতের ইতিহাসে এর গুরুত্ব পলাশীর যুদ্ধের তুলনায় অনেক বেশি। পলাশীর যুদ্ধ যেখানে মূলত একটি ষড়যন্ত্রমূলক খণ্ডযুদ্ধ ছিল, সেখানে বক্সারের যুদ্ধ ছিল পূর্ণাঙ্গ সম্মুখ সমর; এই যুদ্ধে মুঘল সম্রাট, অযোধ্যার নবাব ও মীর কাসিমের সম্মিলিত শক্তিকে পরাজিত করে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রমাণ করে যে তারা তৎকালীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ সামরিক শক্তি। যুদ্ধের পর লর্ড ক্লাইভ ভারতে ফিরে এসে বিজয়ী শক্তি হিসেবে ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাট ও অযোধ্যার নবাবের সঙ্গে ঐতিহাসিক এলাহাবাদ চুক্তি স্বাক্ষর করেন। 

এই চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও ওড়িশার রাজস্ব আদায়ের আইনগত অধিকার বা ‘দেওয়ানি’ লাভ করে, যার ফলে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে শক্তিশালী রাজনৈতিক শাসনক্ষমতায় পরিণত হয়। দেওয়ানি লাভের পর বাংলায় ‘দ্বৈত শাসন’ ব্যবস্থা চালু হয়, যেখানে নবাবের হাতে থাকে নামমাত্র প্রশাসনিক দায়িত্ব, কিন্তু প্রকৃত অর্থনৈতিক ক্ষমতা থাকে কোম্পানির হাতে। এর পরিণতিতে মুঘল সম্রাট কার্যত ব্রিটিশদের পেনশনে নির্ভরশীল শাসকে পরিণত হন এবং অযোধ্যা একটি অনুগত ‘বাফার স্টেট’ হিসেবে ব্রিটিশ প্রভাবাধীন অঞ্চলে রূপ নেয়।

বক্সারের যুদ্ধের পর ইংরেজরা দ্রুত তাদের বিজয়ের সুফল ভোগ করতে শুরু করে এবং অযোধ্যা, বেনারস ও এলাহাবাদের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। যুদ্ধজনিত ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ হিসেবে অযোধ্যার নবাব সুজা উদ দৌলা ইংরেজদের প্রায় ৫০ লাখ রুপি জরিমানা দিতে বাধ্য হন। এর ধারাবাহিকতায় ইংরেজরা ধীরে ধীরে ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করে এবং বর্তমান বাংলাদেশের গাজীপুরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলো কোম্পানির অধীনে চলে যায়। কয়েক বছরের মধ্যেই ইংরেজরা মুঘল সম্রাটকে প্রদত্ত ভর্তুকি বন্ধ করে দিলে সম্রাট কার্যত তাদের ওপর নির্ভরশীল ও ক্ষমতাহীন অবস্থায় পরিণত হন। এ সুযোগে ইংরেজরা অতি দ্রুত বাংলার প্রশাসনিক ক্ষমতা নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত করে ফেলে।

পরিশেষে 

পলাশীর যুদ্ধ যদি ব্রিটিশদের জন্য বাংলার দুয়ার খুলে দিয়ে থাকে, তবে বক্সারের যুদ্ধ তাদের হাতে তুলে দিয়েছিল পুরো ভারতের চাবিকাঠি। তিন বিশাল শক্তি মুঘল সম্রাট, অযোধ্যার নবাব এবং বাংলার নবাবের সম্মিলিত পরাজয় প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, ভারতের পুরনো শাসনকাঠামো আধুনিক রণকৌশলের সামনে কতটা ভঙ্গুর। এই যুদ্ধ মুঘলদের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা এবং প্রশাসনিক খোলনলচে যে কতটা জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল, তা নগ্নভাবে প্রকাশ করে দেয়। খোদ দিল্লির সম্রাট যখন বিদেশি এক বণিক গোষ্ঠীর কাছে পরাজিত ও পেনশনে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, তখন ভারতের কেন্দ্রীয় শক্তির নৈতিক পতন ঘটে।