বাংলাদেশের কুটির শিল্প রচনা ২০, ২৫ পয়েন্ট

প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় আমরা বাংলাদেশের কুটির শিল্প রচনাটি ২৫টি পয়েন্টের মাধ্যমে তোমাদের সামনে তুলে ধরব। আশা করি এটি তোমাদের কাজে লাগবে। তবে আমরা রচনা মুখস্থ করায় নিরুৎসাহিত করি।

এই রচনার মাধ্যমে তোমরা শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতিই নিতে পারবে না, বরং বাংলাদেশের কুটির শিল্প সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবে। তোমাদের সুবিধার্থে নিচে বাংলাদেশের কুটির শিল্প রচনাটি ২০টি পয়েন্টে দেওয়া হলো।

ভূমিকা

সাধারণত, স্বল্প মূলধন ব্যবহার করে গরিব লোকেরা নিজেদের বাড়িতে যে পণ্যদ্রব্য উৎপাদন করে, তাকেই কুটির শিল্প বলা হয়। এই শিল্পে বেশি সংখ্যক লোকবল অথবা খুব দামি যন্ত্রপাতির কোনো প্রয়োজন হয় না।

বাংলাদেশের কুটির শিল্প অতি প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। তাঁতের শাড়ি ও কাপড়, বাঁশ ও বেতের তৈরি জিনিসপত্র, মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, দা-কুড়াল, ছুরি, কাঁচি, শীতল পাটি এবং মাছ ধরার বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এগুলো সবই কুটির শিল্পের আওতাভুক্ত।

কুটিরশিল্পের বৈশিষ্ট্য

কুটির শিল্পের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অল্প খরচে দ্রব্য উৎপাদন করা। বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানের মতো এতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয় না। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায়, এই শিল্পে উৎপাদিত পণ্যগুলোর মূল্যও কম থাকে। তবে, বর্তমানে যন্ত্রের সাহায্যে তৈরি জিনিসের সাথে হাতে তৈরি জিনিসের চাকচিক্যগত পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ে।

এই কারণে, কুটির শিল্পজাত পণ্যগুলোর মান আরও উন্নত ও মসৃণ হওয়া প্রয়োজন। যদিও সকল পণ্যই যে মানের দিক থেকে খারাপ, তা নয়। এমন অনেক পণ্য এখনো আছে যা দেশ-বিদেশে বিপুল প্রশংসা কুড়িয়ে চলেছে।

আরো দেখুনঃ আমাদের বিদ্যালয় রচনা ৩য় শ্রেণি – ১০ টি পয়েন্ট

কুটির শিল্পের অতীত গৌরব

বাংলাদেশের কুটির শিল্পের অতীত ছিল বিশ্বজুড়ে সম্মানিত এবং অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী।  বিশ্বের সবচেয়ে সূক্ষ্ম বস্ত্র, ঢাকাই মসলিন, ছিল এই শিল্পের প্রতীক। এটি এত সূক্ষ্ম ছিল যে রাজকীয় পরিবারগুলোর কাছে এর কদর ছিল সর্বাধিক, যা বাংলার অর্থনৈতিক প্রতিপত্তি নিশ্চিত করত।

মসলিন ছাড়াও জামদানি শাড়ি বুনন কৌশলটি ছিল শিল্পীদের নিপুণ দক্ষতার প্রমাণ, যা আজও ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত। টাঙ্গাইল ও পাবনার তাঁত বস্ত্রও ছিল গুণগত মান এবং সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। নকশি কাঁথা, মৃৎশিল্প এবং কাসা-পিতলের মতো ধাতুশিল্প ছিল বাংলার সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি।

ব্রিটিশ শাসনের পূর্বে, কুটির শিল্পই ছিল বাংলার প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। এই রপ্তানিমুখী পণ্যগুলি এই অঞ্চলে প্রচুর সম্পদ নিয়ে আসত এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করত। একসময় বাংলার কুটির শিল্প গুণগত মান, শৈল্পিকতা এবং অর্থনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে বিশ্বসেরা ছিল। উপনিবেশিক শাসনে এই গৌরব ক্ষুণ্ন হলেও, এর ঐতিহ্য আজও দেশের সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে টিকে আছে।

 

বাংলার কুটিরশিল্পের ঐতিহ্য

বাংলার কুটির শিল্পের অতীত ঐতিহ্য ছিল অত্যন্ত উজ্জ্বল। এই শিল্পের মধ্যে ঢাকাই মসলিন ছিল জগদ্বিখ্যাত। এ ছাড়াও, যশোরের বোতাম ও চিরুনিশিল্প এবং ঢাকার অত্যাশ্চর্য শঙ্খ-শিল্প বিশ্বজুড়ে বিস্ময় সৃষ্টি করত।

এছাড়া, বাংলার মিষ্টান্নশিল্প, মাদুরশিল্প, সূচিশিল্প, চর্মশিল্প, হাতে তৈরি কাগজ, সাবান, ঝিনুক, বাঁশ ও বেতের নানারকম জিনিস, কাচের চুড়ি, এবং কার্পেট ইত্যাদি শিল্পেরও ব্যাপক কদর ছিল। এই কুটির শিল্পীরা বংশপরম্পরায় একই ধরনের শিল্পের চর্চা করে আসত।

কুটিরশিল্প সৃষ্টির প্রেক্ষাপট

একসময় বাংলাদেশের গ্রামগুলো ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং গ্রামীণ মানুষজন ছিল স্বনির্ভর। গ্রামীণ অর্থনৈতিক কাঠামো মূলত কৃষিনির্ভর ছিল। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনের সকল প্রয়োজনীয় জিনিস গ্রামের মানুষ নিজেরাই তৈরি করত, যার মূল লক্ষ্য ছিল নিজেদের প্রয়োজন মেটানো।

এভাবেই বিভিন্ন পেশার মানুষ কুটির শিল্পের একেকটি শাখায় নিয়োজিত হতেন। কেউ বস্ত্রশিল্পে, কেউ মৃৎশিল্পে, কেউ কাঠশিল্পে আবার কেউ ধাতুশিল্পে যুক্ত থাকতেন, এবং এভাবেই কুটির শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটেছিল। একপর্যায়ে দেখা যায়, গ্রামের অর্থনীতি কুটির শিল্পনির্ভর হয়ে উঠেছিল।

ঐতিহ্যের ধারক

বাংলাদেশের কুটির শিল্প হলো আমাদের হাজার বছরের পুরোনো লোকশিল্প ও সংস্কৃতির শিকড়স্বরূপ। এটি কোনো আধুনিক কারখানার উৎপাদন নয়, বরং এটি মূলত পারিবারিক পরিবেশের মধ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরিত হওয়া দক্ষতা ও জ্ঞানের ফল।

এই শিল্পীরা তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে শেখা বিশেষ কৌশলগুলো কাজে লাগিয়ে এমন সব পণ্য তৈরি করেন, যা দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে সজীব রাখে। এই শিল্পের প্রতিটি পণ্যই যেন ইতিহাসের একটি ক্ষুদ্র অংশ, যা আমাদের অতীতকে বর্তমানের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত করে। এই মূল্যবান ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সবার।

দেখে নিনঃ কৃষি কাজে বিজ্ঞান রচনা ১০, ২০ পয়েন্ট

বৃহৎ শিল্পের সাথে তুলনা

এ দেশে বহুকাল আগে থেকেই কুটিরশিল্পের ব্যাপক প্রচলন ছিল। এখানকার তৈরি নানা ধরনের কুটিরশিল্পের নিদর্শন বিশ্বের বহু মানুষের সশ্রদ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে, একটি খারাপ সময় আসে যখন ইংরেজ শাসনামলে সরকারের কোনো সুদৃষ্টি না থাকায় এই শিল্পের যথেষ্ট অবনতি ঘটে। এই সঙ্কটাপন্ন অবস্থায়ও কুটিরশিল্পের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায়নি।

কারণ তখনো পর্যন্ত দেশে কোনো বৃহদায়তন শিল্প-প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখন দেশে বৃহদায়তন শিল্প-কারখানার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটছে, আর তাই কুটিরশিল্পের অবস্থা ততটা সুবিধাজনক বলে মনে হচ্ছে না। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৃহদায়তন শিল্পের ওপর যতটা নির্ভর করা যায়, কুটিরশিল্পের ওপর ততটা নির্ভর করা যায় না।

এছাড়াও, দেশ বিভাগের ফলে কুটিরশিল্পের ওপর যথেষ্ট বিপর্যয় নেমে এসেছিল। এই সময়ে কখনো দক্ষ কারিগরের অভাব দেখা দিয়েছে, আবার কখনো বা বাজার বিনষ্ট হয়েছে।

অর্থনৈতিক গুরুত্ব

কুটির শিল্পকে প্রায়শই দেশের অর্থনীতির ‘নীরব সেবক’ বলা হয়, যা গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখার মূল চাবিকাঠি। যেখানে বৃহৎ শিল্পে বিনিয়োগের বিশাল ঝুঁকি থাকে, সেখানে কুটির শিল্প কম পুঁজি ব্যবহার করে গ্রামীণ মানুষের জন্য স্থানীয়ভাবে আয়ের সুযোগ তৈরি করে।

স্থানীয় বাজারে এর চাহিদা গ্রামীণ অর্থ প্রবাহকে শক্তিশালী করে। বিশেষ করে ফসল তোলার মৌসুমের বাইরে এই শিল্প মানুষকে অর্থ উপার্জনের সুযোগ দেয়। এভাবে এই ক্ষুদ্র শিল্পটি পরোক্ষভাবে জাতীয় অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতা প্রদান করে।

গ্রামকেন্দ্রিক বাংলার কুটির শিল্প

কুটির শিল্প সৃষ্টির মূল উৎস ছিল গ্রাম। এই শিল্পকে কেন্দ্র করেই গ্রামে সূত্রধর, কর্মকার, কুমার, শাঁখারী-এর মতো নানা সম্প্রদায়ের আবির্ভাব হয়েছিল। এরাই ছিল কুটিরশিল্পের ধারক ও বাহক।

তাঁতিরা কাপড়-গামছা বুনত; কুমোররা তৈরি করত হাঁড়ি-কলসি। কামাররা নির্মাণ করত কোদাল, কুড়াল, কাস্তে, হাতুড়ি, ছুরি, কাঁচি ইত্যাদি। অপরদিকে, ছুতাররা নানারকম কাঠের জিনিস প্রস্তুত করত এবং শাঁখারীরা তৈরি করত শাঁখের জিনিস।

কাঁথা ও নকশি কাঁথা

নকশি কাঁথা হলো বাংলার নারীদের হৃদয়ের গল্প, যা বাংলার লোকশিল্পের এক অসাধারণ অভিব্যক্তি। এই শিল্পে গ্রামীণ নারীরা পুরনো কাপড় বা শাড়ির পাড় ব্যবহার করে সুঁই-সুতার মাধ্যমে তাদের দৈনন্দিন জীবন, প্রকৃতির দৃশ্য, লোককথা, এবং স্বপ্ন ফুটিয়ে তোলেন। প্রতিটি সেলাই যেন এক একটি অনুভূতি, যা শত শত মোটিফের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কাঁথা কেবল শীত নিবারণের উপকরণ নয়, এটি গ্রামবাংলার লোকায়ত জীবনের একটি গভীর দলিল।

মৃৎশিল্প

বাংলাদেশের কুমার বা পাল সম্প্রদায় এই প্রাচীন মৃৎশিল্পকে আজও বাঁচিয়ে রেখেছে, যার প্রধান কাঁচামাল হলো মাটি। হাতে বা চাকার সাহায্যে নির্মিত হাঁড়ি, কলসি, সরা, ফুলদানি, মাটির খেলনা এবং টেরাকোটার মতো কাজগুলো বাংলাদেশের লোকশিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে। মৃৎশিল্প পরিবেশবান্ধব এবং এর মাধ্যমে তৈরি জিনিসপত্রের একটি বিশেষ নান্দনিক মূল্য রয়েছে। আধুনিক জীবনে প্লাস্টিকের ভিড়েও মাটির জিনিসের ঐতিহ্য এবং এর শীতলতা অমূল্য।

বাঁশ ও বেত শিল্প

দেশের বিশেষত সিলেট, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে সহজলভ্য বাঁশ ও বেত ব্যবহার করে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং শৌখিন সামগ্রী তৈরি করা হয়। ঝুড়ি, পাটি, মোড়া, আসবাবপত্র, এবং গৃহস্থালীর বিভিন্ন জিনিসপত্র এই শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এই শিল্পটি সাধারণত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দ্বারা পরিচালিত হয় এবং এটি পরিবেশের সাথে সহাবস্থান বজায় রেখে পণ্য তৈরির একটি চমৎকার উদাহরণ।

পাট ও শিকা শিল্প

বাংলাদেশের সোনালী আঁশ পাটকে কাজে লাগিয়ে কারিগররা এখন শুধু বস্তা নয়, বরং নান্দনিক ডিজাইনের ব্যাগ, কার্পেট, ডেকোরেটিভ ওয়াল হ্যাঙ্গিং এবং শিকা তৈরি করছেন। বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সুরক্ষার প্রবণতা বাড়ার কারণে পাটের তৈরি পরিবেশবান্ধব পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং গ্রামীণ কারিগরদের জন্য উচ্চ আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।

শঙ্খ ও ঝিনুক শিল্প

বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় এলাকা, বিশেষত কক্সবাজার ও কুয়াকাটায়, ঝিনুক ও শঙ্খের ব্যবহার করে এক মনোমুগ্ধকর হস্তশিল্প তৈরি হয়। স্থানীয় কারিগরদের হাতে তৈরি এই শিল্পকর্মে চুড়ি, কানের দুল, বিভিন্ন শোপিস এবং নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী অলঙ্কার স্থান পায়। এই সৃজনশীল শিল্পকর্মটি সমুদ্রের প্রাকৃতিক সম্পদকে শৈল্পিক উপায়ে ব্যবহার করে, যা দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় এক স্যুভেনির হিসেবে পরিচিত।

কাঠের কারুশিল্প

দক্ষ কাঠমিস্ত্রিদের নিপুণ হাতে কাঠ খোদাই করে তৈরি হয় ঐতিহ্যবাহী নকশা, ধর্মীয় ভাস্কর্য, পুতুল এবং নানা ধরনের আসবাবপত্র। এই শিল্পটি সম্পন্ন করতে নকশার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সূক্ষ্মতা এবং যথেষ্ট ধৈর্যশীলতার প্রয়োজন হয়। কাঠের এই কারুশিল্পে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মোটিফ ও নকশার প্রতিফলন সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়, যা ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে এক বিশেষ নান্দনিক মাত্রা যোগ করে।

যন্ত্রশিল্প ও কুটির শিল্প

অষ্টাদশ শতকে যখন যন্ত্র শিল্পের যুগ শুরু হলো, তখন থেকেই পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই কুটির শিল্প তার অস্তিত্ব সংকটে পড়লো। এর কারণ খুবই স্পষ্ট: যন্ত্র স্বল্প সময়ে এবং তুলনামূলকভাবে কম খরচে বিপুল পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম। এই দ্রুত গতির উৎপাদনের সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে ক্ষুদ্রায়তন হস্তশিল্পগুলো প্রতিযোগিতার ময়দানে পিছিয়ে পড়তে বাধ্য হলো।

আমাদের দেশের ক্ষেত্রে এই বিপর্যয়ের মাত্রা ছিল আরও ভয়াবহ ও পরিকল্পিত। ইংরেজ শাসকরা তাদের নিজেদের দেশের যন্ত্রে তৈরি পণ্যসামগ্রী বিক্রি করার জন্য সুকৌশলে এখানকার ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। এর ফল হয়েছে মারাত্মক।

বেকার সমস্যা সমাধানে কুটির শিল্প

আমাদের দেশে বর্তমানে বেকার সমস্যা যে ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে, তার একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে কুটির শিল্পের ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে। এই প্রসঙ্গে সফল অর্থনীতির দেশ জাপানের উদাহরণ স্মরণ করা যেতে পারে। জাপানের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি বা মেরুদণ্ড হলো তাদের কুটির শিল্প এবং ক্ষুদ্র যন্ত্রশিল্প।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির শতকরা প্রায় ৮৫ জন শ্রমিক এই কুটির ও ক্ষুদ্র শিল্পে নিযুক্ত আছেন। জাপানে প্রায় প্রতিটি পরিবারে প্রত্যেকেই ছোট ছোট যন্ত্রের সাহায্য নিয়ে শিল্পদ্রব্য তৈরি করে থাকেন। জাপান সরকার ন্যায্য মূল্যে সেই পণ্যগুলো কারিগরদের কাছ থেকে কিনে নেয়।

এভাবে দেশটিতে একদিকে যেমন বেকার সমস্যার সমাধান হয়েছে, তেমনি এসব শিল্পজাত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে জাপান নিজেদের দেশকে উন্নত করতে সক্ষম হয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়ন

কুটির শিল্প গ্রামীণ নারীদের ঘরে বসেই কাজের সুযোগ দেয়, যা তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলে। নিজেদের আয়ের উৎস তৈরি হওয়ায় পরিবারে তাদের মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিশ্চিতভাবে বৃদ্ধি পায়।

কুটিরশিল্পের বর্তমান অবস্থা

একসময় যে কুটির শিল্প এদেশকে বিশ্ববিশ্রুত মর্যাদা এনে দিয়েছিল, আজ তার অবস্থা হতাশাজনক। যন্ত্রশিল্পের ব্যাপক প্রসারের কারণে কুটির শিল্প এখন কোণঠাসা। পৃথিবীর বিলাসী জাতিরা একসময় ভারতবর্ষের কুটির শিল্প পণ্যের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত।

তবে যান্ত্রিকতার বিপরীতে এই শিল্প তার সমৃদ্ধ ও গৌরবময় অতীত হারিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে। যদিও সাধারণ মানুষের হাতের ছোঁয়ায় এই শিল্পের গায়ে যে কারুকার্য খচিত হয়, তা বৃহদায়তন শিল্পে অনেক সময় সম্ভব হয় না। বিশেষত কুটিরবাসী মানুষের তৈরি নকশিকাঁথা, শীতলপাটি, মাটির দ্রব্য, বেতের পণ্য, হাতে তৈরি তাঁতবস্ত্র কিংবা জামদানি শাড়ির শৈল্পিক আবেদন কোনোদিনই নিঃশেষ হবে না।

টেকসই ভবিষ্যৎ

পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির এই সময়ে, পরিবেশবান্ধব কাঁচামাল-নির্ভর কুটির শিল্প একটি নতুন দিগন্ত খুলেছে। এই শিল্পগুলো যেহেতু কম দূষণ সৃষ্টি করে এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে, তাই এটি একটি টেকসই অর্থনৈতিক মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিপুল সম্ভাবনা রাখে।

কুটিরশিল্পের বর্তমান দুর্দশার কারণ

আমাদের দেশের কুটিরশিল্পের বর্তমান অবস্থা খুবই বিপন্ন। এই দুরবস্থার পেছনে বেশ কিছু গুরুতর কারণ রয়েছে, যা প্রধানত তিনটি ভাগে আলোচনা করা যেতে পারে।

কুটিরশিল্পের দুর্দশার অন্যতম প্রধান কারণ হলো যন্ত্রশিল্পের সাথে অসম প্রতিযোগিতা। বৃহৎ কলকারখানায় আধুনিক যন্ত্রপাতির সহায়তায় অল্প সময়ে এবং অপেক্ষাকৃত কম খরচে প্রচুর পরিমাণে পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব হয়। কিন্তু কুটিরশিল্পের ক্ষেত্রে এই সুবিধা নেই। কুটিরশিল্পের প্রতিটি কাজই শারীরিক শ্রমের মাধ্যমে হাতে করতে হয়।

আমাদের জনগণের বদলে যাওয়া রুচি কুটিরশিল্পের অবনতির আরেকটি প্রধান কারণ। অনেক সময় দেখা যায়, আমরা কুটিরশিল্পজাত মজবুত ও টেকসই পণ্যের পরিবর্তে যন্ত্রশিল্পে তৈরি চকচকে ও আকর্ষণীয় দ্রব্যাদির প্রতি বেশি আকৃষ্ট হই।

দেশীয় কুটিরশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে গভীর মানসিকতা এবং স্বদেশপ্রেমের প্রয়োজন, দুর্ভাগ্যবশত আমরা তা থেকে অনেক দূরে সরে গেছি। আমাদের মধ্যে এই প্রবণতা দেখা যায় যে, বিদেশে তৈরি মন ভুলানো হালকা জিনিসের জন্য বাড়তি টাকা খরচ করতে আমরা কোনো দ্বিধা করি না।

কুটির শিল্পের প্রয়োজনীয়তা

আমাদের ভারতবর্ষ এখনও প্রধানত কৃষিনির্ভর। কিন্তু বর্তমানে নানা কারণে শুধু কৃষির ওপর নির্ভর করে গ্রামীণ মানুষের জীবনধারণ করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলস্বরূপ, বহু কৃষক দিন দিন ভূমিহীন বেকারে পরিণত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতি গ্রামীণ অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেওয়ায় সারা দেশের শিল্পের অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

তবে এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন প্রথম এবং প্রধান সরকারি উদ্যোগ। পিতল-কাঁসার বাসন, মাদুর, পাটি, কাঠের আসবাবপত্র, মাটির পুতুল, সূচিশিল্প—এই ধরনের ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পগুলো যদি পরিকল্পিত সরকারি সাহায্য পায়, তবে তার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকার সংস্থান সম্ভব হতে পারে।

কুটিরশিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

বৈদেশিক ঋণে জর্জরিত আমাদের বাংলাদেশের পক্ষে বৃহৎ শিল্পে বিপুল পরিমাণ মূলধন বিনিয়োগের সামর্থ্য নেই। যদি জাপানের মতো একটি উন্নত দেশের শ্রমশক্তির ত্রিশ ভাগ কুটিরশিল্পে এবং পঞ্চান্ন ভাগ ক্ষুদ্র যন্ত্রশিল্পে নিয়োজিত হতে পারে, তবে আমাদের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে আমরাই বা পিছিয়ে থাকব কেন?

বিশেষ করে, দেশের প্রায় এক কোটি বেকার মানুষকে আত্মকর্মসংস্থানের পথে চালিত করার ক্ষেত্রে কুটিরশিল্পই আমাদের সঠিক পথ দেখাতে পারে। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন বেকারত্ব সমস্যার সমাধান হবে, তেমনি অন্যদিকে বৈদেশিক পণ্য আমদানির ফলে সৃষ্ট বাণিজ্যিক ঘাটতি থেকেও আমরা রক্ষা পাব।

কুটিরশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার উপায়

আমাদের মতো একটি দরিদ্র দেশের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে হলে অবশ্যই কুটিরশিল্পের পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কুটিরশিল্পজাত দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয়ের জন্য সরকারি উদ্যোগ একান্তভাবে জরুরি।দেশের নারী সমাজের একটি বৃহৎ অংশকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে এই কুটিরশিল্পের কাজে নিয়োজিত করতে হবে।

পাশাপাশি, দেশের বাইরেও এই শিল্পজাত দ্রব্যাদির জন্য নতুন বাজার সৃষ্টিতে সচেষ্ট হতে হবে। এছাড়াও, নতুন নতুন কুটিরশিল্প উৎপাদনে সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরকারি এবং বেসরকারি উভয় পর্যায়ের সাহায্য ও সহযোগিতা একান্তভাবে কাম্য।

কুটিরশিল্প উন্নয়নে বর্তমান উদ্যোগ

বাংলাদেশের কুটিরশিল্প এখনও বহুলাংশে ঐতিহ্যবাহী। উদাহরণস্বরূপ, রাজশাহীর সিল্ক, ঢাকা-টাঙ্গাইল-পাবনার তাঁতশিল্প, নারায়ণগঞ্জের হোসিয়ারি পণ্য, সিলেটের বাঁশ ও বেতের কাজ, ময়মনসিংহের পিতল-কাঁসার সামগ্রী, কুমিল্লার বাঁশ ও কাঠের জিনিস এবং কক্সবাজারের ঝিনুক শিল্প এগুলো আজও কুটিরশিল্পের অতীত ঐতিহ্য ও সুনাম বয়ে চলেছে।

কুটিরশিল্পের বর্তমান অবস্থা, সম্ভাবনা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে বর্তমানে সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা এই শিল্পের উন্নতির জন্য বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসছে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প সংস্থা এই শিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যে কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান, কুটিরশিল্পের আধুনিকীকরণ, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং মূলধন সরবরাহ এইসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

উপসংহার

বাংলাদেশের কুটির শিল্প হলো আমাদের ঐতিহ্যের ধারক, অর্থনীতির চালিকাশক্তি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি ভরসার নাম। এই শিল্প কেবল গ্রামীণ উন্নয়নকেই নিশ্চিত করে না, এটি নারীর ক্ষমতায়ন, সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গেও নিবিড়ভাবে জড়িত।

আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তির সহায়তা পেলে কুটির শিল্প আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সমন্বিত প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই।