স্বদেশ প্রেম রচনা ২০ ও ২৫ পয়েন্ট (SSC ও HSC)
প্রিয় শিক্ষার্থী বন্ধুরা, আজকের ব্লগে আমরা স্বদেশ প্রেম রচনাটি আপনাদের জন্য শেয়ার করবো। আমাদের জীবনে দেশ প্রেমের গুরুত্ব অপরিসীম। জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা মানুষকে ত্যাগী, সৎ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। ইতিহাস প্রমাণ করে, যে জাতির মানুষের হৃদয়ে স্বদেশ প্রেম থাকে, তারা কখনো পরাজিত হয় না।
তাই ছাত্র ছাত্রীদের জন্য স্বদেশ প্রেম রচনা ২৫ পয়েন্ট শুধু পরীক্ষার জন্য নয়, বরং জীবনের বাস্তব শিক্ষার ও অংশ। এই রচনার মাধ্যমে আমরা শিখতে পারি কীভাবে দেশের জন্য ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও আত্মত্যাগ একটি জাতিকে উন্নতির পথে এগিয়ে নেয়। নিচে স্বদেশ প্রেম রচনাটি দেওয়া হলো।
রচনাঃ স্বদেশ প্রেম
আরো দেখুনঃ মহানবী সাঃ এর জীবনী রচনা
ভূমিকা
স্বদেশ প্রেম হলো মানুষের মনের গভীরে প্রোথিত এক অনন্য অনুভূতি। এই আবেগ তাকে তার মাতৃভূমির প্রতি এক চিরন্তন ভালোবাসার বাঁধনে বেঁধে রাখে। যে মাটিতে আমাদের জন্ম, যেখানে আমরা বেড়ে উঠেছি এবং জীবনের প্রতিটা মুহূর্ত উপভোগ করছি, সেটাই তো আমাদের স্বদেশ।
মা যেমন তার সন্তানকে বুকের দুধ খাইয়ে লালন করেন, ঠিক তেমনি দেশও আমাদের দেয় আমাদের পরিচয়, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। তাই, নিজের দেশকে ভালোবাসা এবং দেশের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করাই হলো প্রকৃত স্বদেশ প্রেম।
স্বদেশ প্রেম কী
দেশপ্রেম বলতে বোঝায় নিজের দেশ, জাতি এবং মাতৃভাষার প্রতি তীব্র আকর্ষণ ও গভীর আনুগত্য। খুব সহজভাবে বললে, স্বদেশপ্রেম হলো নিজের দেশকে মন থেকে ভালোবাসা।
মানুষ যখন বিদেশে যায়, তখন তার মন সেই আজন্মের স্মৃতিঘেরা জন্মস্থানের জন্য ব্যাকুল হয়। বিদেশে দীর্ঘ সময় কাটালেও, জন্মভূমির টান কেউ এড়াতে পারে না। স্বদেশের প্রতিটি জিনিসই তখন তার কাছে পরম মমতার বস্তু বলে মনে হয়।
ইতিহাসে স্বদেশ প্রেমের উদাহরণ
বাংলার ইতিহাসে স্বদেশ প্রেমের বহু উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা চিরকাল অমর হয়ে আছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সময়ে ক্ষুদিরাম, প্রীতিলতা, এবং সূর্য সেনের মতো বীরেরা দেশের স্বাধীনতার জন্য হাসিমুখে জীবন উৎসর্গ করেছেন। মানব ইতিহাসের পাতায় দেশপ্রেমিকদের এমন মহৎ আত্মত্যাগ চিরকালই শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত।
বাংলাদেশেও এর অসংখ্য উদাহরণ বিদ্যমান। বিদেশি শক্তি বারবার এই ভূখণ্ডে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করেছে, আর বাঙালি জাতি নিজেদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে অকাতরে প্রাণ দিয়েছে।
এই ধারাবাহিকতায়, ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে রফিক, শফিক, সালাম, জব্বার ও বরকতের মতো শহীদদের আত্মদান আমাদের স্বদেশ প্রেমকে এক নতুন মাত্রা প্রদান করে। এর পরবর্তীতে, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ সমাজের সর্বস্তরের অগণিত মানুষ দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন।
এই অসাধারণ আত্মত্যাগই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের স্বদেশের প্রতি অনন্ত ভালোবাসায় উদ্বুদ্ধ। আর এই স্বদেশ প্রেমই হলো এই জাতির শক্তির প্রধান ও মূল ভিত্তি।
স্বদেশপ্রেমের তাৎপর্য
যে দেশে মানুষ জন্মগ্রহণ করে, সেই দেশের প্রতি তার মনে এক বিশেষ দুর্বলতা তৈরি হয়। এই দুর্বলতা আসলে গভীর ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। এই ভালোবাসার কারণেই মানুষ দেশকে ভালোবেসে জীবন দিতেও কখনো দ্বিধাবোধ করে না।
স্বদেশপ্রেম মানুষকে বীরত্ব ও সাহসিকতার শিক্ষা দেয়। সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সংগ্রাম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে স্বদেশপ্রেমই প্রধান প্রেরণা জোগায়। এছাড়াও, দেশের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধও এই স্বদেশপ্রেমের মাধ্যমেই জাগ্রত হয়।
স্বদেশপ্রেমের বৈশিষ্ট্য
স্বদেশপ্রেমের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো দেশ ও জাতির প্রতি অগাধ ভালোবাসা, আত্মত্যাগের মানসিকতা এবং দেশের সম্মান রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ হওয়া। একই সাথে, একটি দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সম্পদ রক্ষার মানসিকতা থাকাও স্বদেশপ্রেমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
স্বদেশপ্রেম ব্যক্তি ও সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে তোলে এবং দেশের উন্নয়ন ও সুরক্ষায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই মহৎ গুণটি মানুষের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ ও জাতীয় চেতনাকে জাগ্রত করে। একজন দেশপ্রেমিক ব্যক্তি সবসময় নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে দেশের উন্নতি এবং দেশের অন্য মানুষদের উপকারের কথা চিন্তা করেন। ফলস্বরূপ, দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের বড় কোনো ক্ষতিসাধন কখনোই হয় না।
স্বদেশ প্রেমের গুরুত্ব
স্বদেশপ্রেম হলো একটি জাতির উন্নতির প্রধান চালিকা শক্তি। যে দেশের মানুষ নিজের স্বদেশকে ভালোবাসে, সেই দেশ দ্রুত উন্নতির পথে এগিয়ে যায়। স্বদেশপ্রেম মানুষকে সৎ, দায়িত্বশীল ও কর্মঠ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। এর প্রভাবে নাগরিকেরা দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে সচেষ্ট হয়।
স্বদেশপ্রেম থাকলে মানুষ দুর্নীতি, স্বার্থপরতা ও হিংসা-বিদ্বেষ থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারে এবং দেশকে সবার আগে গুরুত্ব দেয়। এই কারণে বলা যায়, স্বদেশপ্রেমই একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এক শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছে দেয়।
স্বদেশপ্রেমের প্রয়োজনীয়তা
একটি দেশের উন্নয়নের জন্য নাগরিকদের স্বদেশপ্রেম জোরদার হওয়া প্রয়োজন। স্বদেশের প্রতি এই গভীর ভালোবাসা থাকলেই দেশ ও জাতির সংকটের সময় মানুষ আত্মত্যাগে উৎসাহিত হয়। এই স্বদেশপ্রেমই হলো সব কাজের সফলতার মূল। স্বদেশপ্রেমের নৈতিক শক্তি অনেক। বিভিন্ন ধর্মেই দেশপ্রেমের ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে, “দেশপ্রেম ইমানের অঙ্গ”।
প্রাচীন হিন্দু ঋষিরা বলেছেন, ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপী গরিয়সী’। এর অর্থ হলো ‘মা ও মাতৃভূমি স্বর্গের চেয়েও শ্রেষ্ঠ’। এই দেশপ্রেমের বলেই ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিবাহিনী মরণপণ লড়াই করে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে এনেছিল। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে সেদিন লাখো মুক্তিসেনা তাদের রক্ত দিয়েছিলেন।
স্বদেশপ্রেমের প্রভাব
মানবচরিত্রের গুণাবলি বিকাশের ক্ষেত্রে স্বদেশপ্রেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বদেশপ্রেমের চেতনায় উজ্জীবিত হলে একজন মানুষের মন ও মানসিকতায় সার্থক গুণের সমাবেশ ঘটে।
স্বদেশপ্রেমের প্রভাবে তার মন থেকে সংকীর্ণতা ও স্বার্থপরতা দূরীভূত হয়। এই কারণে দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণ চিন্তা জাগ্রত হয় এবং তার মনে জনসেবার অনুভূতি সঞ্চারিত হয়। ফলস্বরূপ, একজন মানুষ দেশের একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে।
স্বদেশপ্রেমের অভিব্যক্তি
সভ্যতার অগ্রগতির পথে একসময় যাযাবর মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস শুরু করে এবং এভাবেই রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। এই স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েই যুগে যুগে মানুষ বিভিন্নভাবে নজির স্থাপন করে গেছে।
আমাদের এই সুজলা-সুফলা সোনার বাংলাকে ভালোবেসে, দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় কিংবা স্বাধীনতাসংগ্রামে অগণিত মানুষ তাদের প্রাণ বিলিয়ে দিয়েছেন—যার কোনো ইয়ত্তা নেই। স্বদেশকে ভালোবাসলেই কেবল আত্মতৃপ্তি অনুভব করা সম্ভব। তাই স্বদেশপ্রেমের অভিব্যক্তি সব সময়ই তৃপ্তিদায়ক হয়ে থাকে।
স্বদেশপ্রেমের ভিন্নরূপ
স্বদেশপ্রেম অবশ্যই আপসহীন হতে হবে। তবে, এই প্রেম যেন কখনোই অন্ধ বা সংকীর্ণ হতে না পারে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কারণ, সংকীর্ণ স্বদেশপ্রেম অন্য দেশকে ঘৃণা করতে শেখায়, যার ফলে জাতিতে জাতিতে দ্বন্দ্ব অনিবার্য হয়ে ওঠে।
উগ্র জাতীয়তাবোধের কারণে পৃথিবীতে অনেক দেশেই জাতিতে জাতিতে প্রাণঘাতী সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। এতে ঝরে পড়েছে বহু প্রাণ এবং বিপন্ন হয়েছে দেশের স্বাধীনতা।
স্বদেশপ্রেমের উপায়
জীবনের সর্বক্ষেত্রে স্বদেশপ্রেমের পরিচয় রাখা সম্ভব। প্রত্যেকটি মানুষই তার নিজ নিজ কর্মের মাধ্যমে স্বদেশপ্রেমে অবদান রাখতে পারে। নিজ নিজ দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করার মাঝেই স্বদেশপ্রেম নিহিত থাকে। মানুষ যত ছোটই হোক না কেন, দেশ ও জাতির জন্য তার কিছু না কিছু করার আছে।
মানবিকতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মহামানবগণ বিশ্ববরেণ্য হয়েছেন, এবং তাদের স্বদেশপ্রেম একসময় বিশ্বপ্রেমে রূপান্তরিত হয়েছে। স্বদেশকে ভালোবাসতে হলে মানুষকে ভালোবাসতে হবে। নিজের দৈন্যদশাকে তুচ্ছ করে দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে হবে।
বাঙালির স্বদেশপ্রেম
এই পৃথিবীতে যুগে যুগে অসংখ্য দেশপ্রেমিক জন্মগ্রহণ করেছেন। তাঁরা নিজ দেশের জন্য আত্মত্যাগ স্বীকার করে দেশ ও বিশ্বের কাছে অমর হয়ে আছেন। বাংলাদেশেও এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বিদ্যমান। ১৯৫২ সালে তৎকালীন পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের হাতে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য রফিক, সালাম, জব্বার, বরকত-সহ আরও অনেকে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেন।
এরপর, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার মরণপণ সংগ্রামে অসংখ্য ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, মা-বোন সহ সাধারণ মানুষ আত্মাহুতি দিয়েছেন। আজও দেশের লক্ষ কোটি জনতা দেশের সামান্য ক্ষতির আশঙ্কায় বজ্র কণ্ঠে গর্জে ওঠে। তাই বলা যায়, এই দেশের মানুষের হৃদয়ে দেশপ্রেমের শিখা চিরন্তন।
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,
ভয় নাই ওরে ভয় নাই,
নিঃশেষে প্রাণ, যে করিবে দান,
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই
ছাত্রজীবনে স্বদেশপ্রেমের শিক্ষা
ছাত্রজীবনে স্বদেশপ্রেমের শিক্ষা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শিক্ষা একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে দেশপ্রেম, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটায়। আসলে, স্বদেশপ্রেম মানে কেবল দেশকে ভালোবাসা নয়, এর অর্থ হলো দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা, দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে গভীরভাবে জানার চেষ্টা করা এবং সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। ছাত্রজীবন থেকেই যদি এই শিক্ষার সূচনা হয়, তবে তারা ভবিষ্যতে দেশের সার্বিক উন্নয়নে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।
ভাষা আন্দোলন ও দেশপ্রেম
বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাংলাদেশের মানুষের স্বদেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের এই আন্দোলন দেশের মানুষের মধ্যে স্বদেশপ্রেমের শিকড়কে আরও গভীর করে তুলেছিল। আর দেশপ্রেমের সেই সুদৃঢ় মনোভাবই পরবর্তীকালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছিল।
মুক্তিযুদ্ধে স্বদেশপ্রেম
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশের স্বাধীনতার জন্য লাখো বাঙালি হাসিমুখে তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। সেই দুঃসময়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের হৃদয়ে যে গভীর, অকৃত্রিম দেশপ্রেম ছিল, তা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক অমর ও ভাস্বর অধ্যায় হিসেবে চিরকাল স্থান করে নেবে।
বর্তমান সমাজে দেশপ্রেম
দেশের সার্বজনীন উন্নয়নের পথে বর্তমান সমাজে দেশপ্রেমের বিকাশ ঘটানো অত্যন্ত জরুরি। এই গভীর দেশপ্রেমই সমাজের মানুষদেরকে সমস্ত বাধা-বিপত্তি জয় করে দেশের অগ্রগতিতে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখতে উদ্বুদ্ধ করে।
পাশাপাশি, সমাজসেবার মাধ্যমেই স্বদেশপ্রেমের প্রকৃত বহিঃপ্রকাশ ঘটে। নিজের দেশকে ভালোবাসা কেবল তার ভৌগোলিক সীমানাকে ভালোবাসা নয়, এটি দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করার অঙ্গীকার। সমাজের দুঃস্থ, অসহায় এবং সুবিধা-বঞ্চিত মানুষের পাশে সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেওয়া এটাই হলো স্বদেশপ্রেমের এক জ্বলন্ত উদাহরণ।
পরিবেশ রক্ষায় দেশপ্রেম
নিজের দেশকে প্রকৃতভাবে ভালোবাসলে দেশের পরিবেশ রক্ষা করা আমাদের জন্য এক অপরিহার্য দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হয়। তাই দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের উচিত বৃক্ষরোপণ, নদী সংরক্ষণ এবং বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে নিজেদের ভূমিকা গুরুত্ব সহকারে পালন করা।
জাতীয় ঐক্যে স্বদেশপ্রেম
জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে স্বদেশপ্রেমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যখন দেশের প্রতি মানুষের মনে গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থাকে, তখন সকল প্রকার ভেদাভেদ দূর হয়ে সমাজে মজবুত ঐক্যের ভিত্তি তৈরি হয়। দেশের প্রতি এই ভালোবাসা থাকলেই সকল নাগরিক জাতির বৃহত্তর উন্নয়নে একসাথে কাজ করতে প্রস্তুত হয়।
অন্যদিকে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও দেশপ্রেম একটি প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। দেশীয় পণ্য ব্যবহার করা, নিয়মিত কর পরিশোধ করা এগুলো দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে এবং জাতিকে সামগ্রিক উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে।
প্রবাসে স্বদেশপ্রেম
বিদেশে অবস্থান করেও নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা সম্ভব। প্রবাসে থাকা মানুষেরা নিয়মিত তাঁদের কঠোর অর্জিত অর্থ দেশে রেমিট্যান্স হিসেবে পাঠিয়ে আমাদের অর্থনীতিকে নিরন্তর সমৃদ্ধ করে চলেছেন। বিদেশে থেকেও দেশের প্রতি এই যে ভালোবাসা প্রকাশ, তা তাঁদের হৃদয়ে থাকা গভীর দেশপ্রেমেরই পরিচয় বহন করে।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও স্বদেশপ্রেম
বাংলাদেশে স্বদেশপ্রেম ও রাজনীতির সম্পর্ক একইসাথে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো রাজনীতিবিদের মধ্যে যদি প্রকৃত দেশপ্রেম থাকে, তবে তা নিশ্চিতভাবে দেশের উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর। একজন ভালো নেতা তাঁর দেশকে উন্নতির সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যেতে সচেষ্ট হন এবং জনগণের কল্যাণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেন। দেশের প্রতি তাঁদের এই গভীর ভালোবাসা গোটা জাতির জন্য আশীর্বাদ ও রহমতস্বরূপ হয়ে ওঠে।
উদ্ভাবন ও গবেষণায় দেশপ্রেম
দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য উদ্ভাবন ও গবেষণায় সক্রিয়ভাবে কাজ করা স্বদেশপ্রেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন কিছু উদ্ভাবন করা এবং দেশের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা এগুলোই মানুষের মধ্যে গভীর স্বদেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।
দেশপ্রেমের অভাব
বর্তমানে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের অভাব বিশেষভাবে চোখে পড়ে। এর অন্যতম কারণ হলো দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা। তাছাড়া, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা এবং দেশের প্রতি দায়িত্ববোধের উপযুক্ত শিক্ষা দেওয়া হয় না। ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আমাদের কাছ থেকে লুকানো হয়।
পাশাপাশি, সমাজে বিদ্যমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, দুর্নীতি এবং নৈতিক মূল্যবোধের অবনতি এইসব নেতিবাচক প্রভাব মানুষের মনে দেশের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ কমিয়ে দিচ্ছে।
অদ্ধ স্বদেশপ্রেমের পরিণতি
স্বদেশপ্রেম নিঃসন্দেহে সমগ্র দেশ ও জাতির জন্য গৌরবের বিষয়। তবে, অন্ধ স্বদেশপ্রেম বহু সময় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই ধরনের অন্ধ ভালোবাসা জাতিতে জাতিতে সংঘাত ও সংঘর্ষকে অনিবার্য করে তোলে। নিজের দেশের জয়গান গাইতে গিয়ে যখন অন্য কোনো জাতির স্বদেশপ্রেমে আঘাত করা হয়, তখন তা দেশ ও জাতির মধ্যে রক্তাক্ত দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে ডেকে আনে।
স্বদেশ প্রেমের অভাবের ক্ষতি
যদি নাগরিকদের মধ্যে স্বদেশপ্রেম না থাকে, তবে সেই দেশ কখনো উন্নতি লাভ করতে পারে না। স্বদেশপ্রেমের অভাবে মানুষ কেবল নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করে এবং জাতীয় স্বার্থকে অবহেলা করে।
এই পরিস্থিতিতে সমাজে দুর্নীতি, অন্যায়, অবিচার ও বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমনকি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও হুমকির মুখে পড়ে যায়। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, স্বদেশপ্রেমহীন জাতি কখনোই টিকে থাকতে পারে না।
উপসংহার
স্বদেশপ্রেম এমন এক শক্তি, যা একটি জাতিকে স্বাধীন, উন্নত ও মর্যাদাশীল করে তোলে। আমাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনও সম্ভব হয়েছিল মানুষের অসীম দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের ফলেই।
তাই, আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য হলো দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা রাখা, দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা এবং সর্বদা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখা। আসলে, স্বদেশপ্রেমই হলো জাতীয় ঐক্য, স্বাধীনতা ও অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি।