মুনাফা নির্ণয়ের সূত্রঃ কীভাবে মুনাফা নির্ণয় করা হয়?

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে ক্রয়–বিক্রয় ও আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত। কেউ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পুঁজি বিনিয়োগ করে পণ্য উৎপাদন করেন এবং সেই উৎপাদিত পণ্য পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। পরে পাইকাররা তাদের ক্রয়কৃত পণ্য খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে সরবরাহ করে, আর শেষ পর্যায়ে খুচরা ব্যবসায়ীরা সেই পণ্য সাধারণ ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করেন। এই প্রতিটি ধাপেই সংশ্লিষ্ট সবাই লাভ বা মুনাফা অর্জনের প্রত্যাশা রাখে। তবে বিভিন্ন পরিস্থিতির কারণে কখনো কখনো লোকসান বা ক্ষতির সম্মুখীনও হতে হয়। 

নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আমরা ব্যাংকে টাকা আমানত হিসেবে রাখি। ব্যাংক সেই অর্থ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করে লাভ অর্জন করে এবং তার একটি অংশ আমানতকারীদের মুনাফা হিসেবে প্রদান করে।  আজ আমাদের আলোচনার বিষয় হচ্ছে মুনাফা নির্ণয়ের সূত্র। আমরা এই লেখার মাধ্যমে সূত্র এবং এর প্রয়োগ উদাহরণের মাধ্যমে দেখাতে চেষ্টা করবো। 

আরও পড়ুনঃ এক কথায় প্রকাশ দ্বিতীয় শ্রেণি

মুনাফা কী?

ব্যাংক মূলত একটি মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। আমরা যখন ব্যাংকে টাকা জমা রাখি, তখন ব্যাংক সেই টাকা অলস বসিয়ে রাখে না। ব্যাংক আপনার জমানো অর্থ বিভিন্ন ব্যবসা, গৃহনির্মাণ বা বড় বড় শিল্পোদ্যোগে ঋণ হিসেবে প্রদান করে।

এই ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে ব্যাংক নির্দিষ্ট হারে মুনাফা বা সুদ আদায় করে। সংগৃহীত সেই মুনাফার একটি অংশ ব্যাংক আমানতকারীকে প্রদান করে। আমানতকারীর কাছে এই অতিরিক্ত টাকাই হলো তার লভ্যাংশ বা প্রফিট। সহজভাবে বলা যায় যে, আপনার টাকা অন্যের প্রয়োজনে কাজে লাগিয়ে ব্যাংক যে আয় করে, তার একটি অংশ আপনাকে দেওয়ার মাধ্যমেই ব্যাংকিং ব্যবস্থা সচল থাকে।

মুনাফা কীভাবে নির্ণয় করা হয়? 

আমরা যখন ব্যাংকে টাকা জমা রাখি, ব্যাংক সেই টাকা অলস বসিয়ে রাখে না। ব্যাংক সেই অর্থ ব্যবসা, গৃহনির্মাণ বা বিভিন্ন উৎপাদনশীল খাতে ঋণ হিসেবে প্রদান করে। এই ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে ব্যাংক ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে নির্দিষ্ট হারে মুনাফা আদায় করে। সংগৃহীত সেই মুনাফার একটি অংশ ব্যাংক আমানতকারীকে প্রদান করে।

মূলধন বা আসল: যে পরিমাণ টাকা প্রথমে ব্যাংকে জমা রাখা হয়েছিল, তাকে মূলধন বা আসল বলে।

মুনাফা: ব্যাংকে টাকা জমা রাখার ফলে ব্যাংক আমানতকারীকে অতিরিক্ত যে টাকা দেয়, সেটিই হলো মুনাফা।

মুনাফার হার: ১০০ টাকার ১ বছরের মুনাফাকে মুনাফার হার বা শতকরা বার্ষিক মুনাফা বলা হয়।

সময়কাল: ঠিক যত সময়ের জন্য মুনাফা হিসাব করা হয়, তাকে সময়কাল বলে।

মুনাফা নির্ণয়ের সূত্রঃ

সরল মুনাফা

সরল মুনাফার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র মূল আসলের ওপর মুনাফা হিসাব করা হয়। এর সূত্রটি হলো:

সূত্রঃ I = Pnr 

I= Interest

P=Principal 

n=Time

r=Rate of interest

চক্রবৃদ্ধি মুনাফা 

চক্রবৃদ্ধি মুনাফার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময় পর পর অর্জিত মুনাফা আসলের সাথে যুক্ত হয় এবং পরবর্তী সময়ে ওই বর্ধিত টাকার ওপর মুনাফা হিসাব করা হয়।

সূত্র: C = P(1 + r)

লাভ ক্ষতির অংকে মুনাফা কীভাবে নির্ণয় করা হয়? 

লাভ-ক্ষতির অংকে ‘মুনাফা’ বা ‘লাভ’ হিসাব করা হয় মূলত ক্রয়মূল্য এবং বিক্রয়মূল্য-এর পার্থক্যের ওপর ভিত্তি করে। তবে ব্যাংকিং বা সুদের অংকে মুনাফা বলতে বিনিয়োগের ওপর অতিরিক্ত আয়কে বোঝায়।

যখন কোনো পণ্য তার ক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করা হয়, তখন লাভ হয়। যেমন – লাভ = বিক্রয়মূল্য – ক্রয়মূল্য

অনুশীলনের জন্য কিছু অংকঃ 

  1. একটি পণ্যদ্রব্য বিক্রয় করে পাইকারি বিক্রেতার ২০% এবং খুচরা বিক্রেতার ২০% লাভ হয়।
  2. যদি দ্রব্যটির খুচরা বিক্রয়মূল্য ৫৭৬ টাকা হয়, তবে পাইকারি বিক্রেতার ক্রয়মূল্য কত?
  3. একজন দোকানদার কিছু ডাল ২৩৭৫.০০ টাকায় বিক্রয় করায় তার ৫% ক্ষতি হলো। ঐ ডাল কত টাকায় বিক্রয় করলে তার ৬% লাভ হতো?
  4. ৩০ টাকায় ১০টি দরে ও ১৫টি দরে সমান সংখ্যক কলা ক্রয় করে সবগুলো কলা ৩০ টাকায়
  5. ১২টি দরে বিক্রয় করলে শতকরা কত লাভ বা ক্ষতি হবে?
  6. বার্ষিক শতকরা মুনাফার হার ১০.৫০ টাকা হলে, ২০০০ টাকার ৫ বছরের মুনাফা কত হবে?
  7. বার্ষিক মুনাফা শতকরা ১০ টাকা থেকে কমে ৮ টাকা হলে, ৩০০০ টাকার ৩ বছরের মুনাফা কত কম হবে?
  8. বার্ষিক শতকরা মুনাফা কত হলে, ১৩০০০ টাকা ৫ বছরে মুনাফা-আসলে ১৮৮৫০ টাকা হবে?
  9. বার্ষিক শতকরা কত মুনাফায় কোনো আসল ৮ বছরে মুনাফা-আসলে দ্বিগুণ হবে?
  10. ৬৫০০ টাকা যে হার মুনাফায় ৪ বছরে মুনাফা-আসলে ৮৮৪০ টাকা হয়, ঐ একই হার মুনাফায় কত টাকা ৪ বছরে মুনাফা-আসলে ১০২০০ টাকা হবে?

FAQs

১০০ টাকার ১ বছরের মুনাফাকে কী বলা হয়?

মুনাফার হার হলো ব্যাংকিং বা আর্থিক লেনদেনের একটি নির্দিষ্ট একক। ১০০ টাকার ১ বছরের মুনাফাকেই মুনাফার হার বা শতকরা বার্ষিক মুনাফা বলা হয়। এটি সাধারণত শতকরা (%) হিসেবে প্রকাশ করা হয়। সহজ কথায়, আপনি যদি ১০০ টাকা ১ বছরের জন্য জমা রাখেন, তবে তার বিপরীতে ব্যাংক আপনাকে অতিরিক্ত যে টাকা দেবে, সেটিই ওই ব্যাংকের মুনাফার হার।

সুদ ও মুনাফার মধ্যে পার্থক্য কি?

ব্যবসায় বিনিয়োগের পর মূলধনের অতিরিক্ত যে অর্থ অর্জিত হয়, তাকে মুনাফা বলে। এটি ব্যবসার ঝুঁকি ও পরিশ্রমের ফল। অন্যদিকে, ঋণ দেওয়া টাকার বিপরীতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য যে অতিরিক্ত অর্থ শর্তহীনভাবে আদায় করা হয়, তাকে সুদ বলা হয়। আবার, মুনাফার ক্ষেত্রে লাভ এবং ক্ষতি উভয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ব্যবসায়ে লোকসান হলে বিনিয়োগকারীকে সেই দায়ভার গ্রহণ করতে হয়। সুদের ক্ষেত্রে ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত অর্থ নিশ্চিতভাবে আদায় করা হয়। এখানে ব্যবসায় লাভ হোক বা লোকসান, গ্রহীতাকে নির্দিষ্ট পরিমাণ সুদ দিতেই হয়।

মুনাফা আসল কাকে বলে? 

কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ব্যাংকে জমা রাখলে বা কাউকে ধার দিলে, নির্দিষ্ট সময় পর সেই টাকার সাথে অতিরিক্ত যে টাকা পাওয়া যায়, তাকে মুনাফা-আসল বা সবৃদ্ধিমূল বলা হয়। ধরুন, আপনি ব্যাংকে ১,০০০ টাকা জমা রাখলেন। এক বছর পর ব্যাংক আপনাকে অতিরিক্ত ১০০ টাকা মুনাফা দিল। তাহলে আপনার মুনাফা-আসল হবে ১,০০০ + ১০০ = ১,১০০ টাকা।

শেষ কথা

মুনাফা নির্ণয়ের সূত্র অর্থনীতি ও ব্যবসার একটি মৌলিক কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্রয়মূল্য, বিক্রয়মূল্য এবং মুনাফার মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে পারলে যে কেউ সহজেই লাভ ক্ষতির হিসাব করতে পারে। দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে বৃহৎ ব্যবসা ও বিনিয়োগ সব ক্ষেত্রেই এই সূত্রগুলোর ব্যবহার রয়েছে। তাই মুনাফা নির্ণয়ের সূত্র সম্পর্কে পরিষ্কার ও ব্যবহারিক ধারণা অর্জন করা প্রত্যেকের জন্যই অপরিহার্য।